নার্সিস্টিক পারসোনালিটি ডিজ-অর্ডার, অদ্ভুত এক মানসিক রোগ

গ্রীক মিথোলজির নার্সিসাসের কথা অনেকেই শুনেছেন। যিনি নিজের প্রেমে এতোটাই মত্ত ছিলেন যে নদীর পানিতে নিজেকে দেখতে দেখতে কখন ডুবে মরে গেছেন নিজেই জানেন না। নার্সিস্টিক পারসোনালিটি ডিজ-অর্ডার রোগটির নাম এই গ্রীক মিথোলজির চরিত্র থেকেই এসেছে।

আমাদের আশপাশে এমন অনেক মানুষকেই আমরা দেখতে পাই যারা আত্মকেন্দ্রিক। এই আত্মকেন্দ্রিকতার চূড়ান্ত রূপ হচ্ছে নার্সিস্টিক পারসোনালিটি ডিজ-অর্ডার। এমন অনেক মানুষ পাবেন যারা দোষ করে নিজের দোষ স্বীকার করার পরিবর্তে আপনার উপরই চাপিয়ে দেবে উল্টো।

Image Source: psychcentral.com

এমন অনেককে পাবেন যারা নিজেদের কষ্টে একেবারে নাজেহাল। কিন্তু আশপাশের মানুষের কষ্ট কখনোই তাদের স্পর্শ করে না। তারা কাঁদতে জানেন, কিন্ত শুধুই নিজেদের জন্য। এই লেখাটিতে আমরা এই ধরণের মানুষের যে রোগে আক্রান্ত তা সম্পর্কে জানতে পারবো।

নার্সিস্টিক পারসোনালিটি ডিজ-অর্ডার কী ?

ব্যক্তিত্বের সমস্যাজনিত ব্যাধিগুলোর মধ্যে একটি এই নার্সিস্টিক পারসোনালিটি ডিজ-অর্ডার। যাতে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তারা চায় সবসময় সবার মনোযোগ এবং প্রশংসার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে। এ ধরনের মানুষের মধ্যে অন্যের প্রতি সহানুভূতির অভাব দেখা যায়।

যে সহানুভূতি তারা দেখায় তা শুধু নিজেকে মহৎ ও যোগ্যতা প্রমাণের জন্য। তাদের দেখে খুব আত্মবিশ্বাসী মনে হলেও চরম আত্মবিশ্বাসের এই মুখোশের আড়ালে একটি ভঙ্গুর আত্ম-মর্যাদাবোধ কাজ করে। যা সামান্যতম সমালোচনায় ভেঙ্গে পরে।

নার্সিস্টিক পারসোনালিটি ডিজ-অর্ডার জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে, যেমন কারো সাথে সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্র, স্কুল বা আর্থিক লেনদেন সম্পর্কিত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করে। নার্সিস্টিক পারসোনালিটি ডিজ-অর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি সাধারণত বিশেষভাবে অসন্তুষ্ট এবং হতাশ হয়ে পারে যখন তাদের প্রশংসা না করা হয়। যা তারা বিশ্বাস করে যে তাদের প্রাপ্য।

Image Source: psychcentral.com

তাদের সম্পর্কগুলো সবসময় অসম্পূর্ণ হয়ে থাকে এবং তাদের চারপাশে থাকা মোটেও উপভোগ্য নয়। তারা যখন জানতে পারে অন্য তার প্রতি আগ্রহ আছে কিংবা তাকে পছন্দ করে, তখন তারা প্রতি মুহূর্তে বিভিন্ন পরিস্থিতির মাধ্যমে চ্যালেঞ্জ করে। তাদের ইগো তখনই কেবল সন্তুষ্ট হয় যখন তার পার্টনার ঐ চ্যালেঞ্জে হেরে যায়।

তাদের মোটিভ কখনোই যাচাই করা নয়। বরং নিজেকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করা। তাই না বুঝেও যদি এমন কারো ফাঁদে পা দিয়ে থাকেন তবে সব যুক্তি-তর্ক জলাঞ্জলি দিয়ে বেড়িয়ে আসুন। এই খেলা আপনাকে এতোটাই নিচে নামিয়ে দেবে যে আপনি একসময় নিজেকে আর খুঁজে পাবেন না। অবাক হয়ে একদিন নিজেকে আবিষ্কার করবেন নোংরা কোনো ডাস্টবিনে, যখন আপনাকে ছুড়ে ফেলা হবে।

কারণ আপনি যখন ভাবছেন অনুভূতি দিয়ে তখন নারসিস্ট ব্যক্তিটি ভাবছে লজিক দিয়ে। আর লজিক জেতার জন্য যা খুশি করতে পারে। কিন্তু অনুভূতি কিংবা হৃদয় ভাবে অন্যদের অনুভূতির কথা, অন্যদের কষ্টের কথা।

Image Source: psychcentral.com

উপসর্গ

নার্সিস্টিক পারসোনালিটি ডিজ-অর্ডারের লক্ষণ এবং লক্ষণগুলোর তীব্রতা ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। তবে সাধারণত নিন্মোক্ত লক্ষ্মণগুলো দেখা যায়,

  • নিজেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা।
  • সবকিছুতে নিজেকে প্রশংসার দাবীদার মনে করা।
  • কোনো ধরণের অর্জন ছাড়াই স্বীকৃতি পাওয়ার আশা করা।
  • নিজের অর্জন এবং প্রতিভা সম্পর্কে অতিরঞ্জিত ধারণা রাখা।
  • সাফল্য, শক্তি, সৌন্দর্য বা নিখুঁত সঙ্গীর কল্পনা নিয়ে ব্যস্ত থাকা।
  • বিশ্বাস করা যে তারা উচ্চ শ্রেণীর এবং কেবল এধরনের ব্যক্তিদের সাথেই তাদের জমবে।
  • কথোপোকথন কিংবা আলোচনা একচেটিয়া হয়ে থাকে সাধারণত নারসিস্ট ব্যক্তির সাথে।
  • অন্যদের নিকৃষ্ট বলে বিবেচনা করা।
  • বিশেষ প্রত্যাশা এবং তাদের প্রত্যাশার সাথে সবার সম্মতি আশা করা।
  • অন্যের প্রয়োজন এবং অনুভূতিগুলোর ক্ষেত্রে উদাসীনতা বা অনাগ্রহী।
  • অনেক সময় প্রয়োজন কিংবা অনুভূতিগুলোর ক্ষেত্রে মনোযোগ শুধুমাত্র তাদের মহত্ত্ব প্রকাশের মাধ্যম হয়ে থাকে। তা ছাড়া অন্য কোনো ধরণের অনুভূতি কাজ করে না।
  • তাদের যা প্রয়োজন তা উদ্ধারে অন্যদের ব্যবহার করা।
  • অন্যের প্রতি ঈর্ষা করা এবং বিশ্বাস করা যে অন্যরা তাকে ঈর্ষা করে।
  • সব ক্ষেত্রে অহঙ্কারী আচরণ।
  • সব কিছুর সেরাটা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা।
  • নিজেকে সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে মনে করা।

Image Source: psychcentral.com

নার্সিস্টিক পারসোনালিটি ডিজ-অর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি তাদের সম্পর্কে নেতিবাচক কোনো কিছু সহ্য করতে না পারা। এ ক্ষেত্রে নেতিবাচক সমালোচনার সম্মুখীন হয়ে তারা তা করতে পারেন তা হচ্ছে,

  • হঠাৎ অস্বাভাবিক রেগে যাওয়া। রাগ নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যাওয়া।
  • ক্রোধ বা অবজ্ঞার সাথে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া জানানো এবং নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য অন্যকে ছোট করার চেষ্টা।
  • আবেগ এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা।
  • মানসিক চাপ মোকাবেলা এবং পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় সমস্যার সম্মুখীন হওয়া।
  • সব সময় হতাশ এবং রাগ অনুভব করা নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায়।
  • নিরাপত্তাহীনতা, লজ্জা, দুর্বলতা এবং অপমানের অনুভূতি।

কখন ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন?

নার্সিস্টিক পারসোনালিটি ডিজ-অর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তি কখনোই এই রোগের উপসর্গের কারণে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন না। কারণ তাদের ইগো কখনোই তাদের এটা করতে দেবে না। তারা সাধারণত হতাশা, ড্রাগ বা অ্যালকোহলের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার, বা অন্য কোনও মানসিক ও স্বাস্থ্য সমস্যার লক্ষণগুলো নিয়ে ডাক্তারের শরণাপন্ন হন।

আপাত দৃষ্টিতে খুব সাধারণ হলেও এটা আপনার জীবন ধ্বংস করে দিতে পারে। এক বিন্দু শান্তি পাবেন না। যদি যথা সময়ে যথাযথ চিকিৎসা না নেন। সঠিক চিকিত্সা আপনার জীবনকে উপভোগ্য করে তুলতে সাহায্য করবে। সঠিক সময়ে যথাযথ পরামর্শ নিন।

Image Source: study.com

কারণ

অন্যান্য মানসিক রোগগুলোর মতো নার্সিস্টিক পারসোনালিটি ডিজ-অর্ডারেরও কারণ গুলো কী হতে পারে তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। তবে নিন্মোক্ত কারণগুলো উল্লেখযোগ্য,

  • পরিবেশ – অতিরিক্ত যত্ন বা সমালোচনার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুদের ক্ষেত্রে এমন হতে পারে।
  • জেনেটিক্স – উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত।
  • নিউরোবায়োলজি – মস্তিষ্ক, আচরণ এবং চিন্তাভাবনার মধ্যে সংযোগজনিত সমস্যা।

ঝুঁকিপূর্ণ দিক

এই রোগ নারীদের চেয়ে পুরুষদের বেশি প্রভাবিত করে। প্রায়শই কৈশোরে বা যৌবনের শুরুতে এর লক্ষন দেখা যায়। যদিও কিছু বাচ্চা শৈশবে নার্সিস্টিক বৈশিষ্ট্যগুলো দেখাতে পারে। তবে এটি তাদের বয়সের সাধারণ প্রভাব মাত্র। এর অর্থ এই নয় যে তারা নার্সিস্টিক পার্সোনালিটি ডিজ-অর্ডারে আক্রান্ত। শিশুদের ক্ষেত্রে এটা প্রযোজ্য নয়।

Image Source: facebook.com

কিছু গবেষক মনে করেন যে, জৈবিকভাবে দুর্বল শিশুদের মধ্যে, ওভারপ্রোটেক্টিভ বা অবহেলার শিকার শিশুদের মধ্যে এর প্রকোপ দেখা যায়। জেনেটিক্স এবং নিউরোবায়োলজি নার্সিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার বিকাশে ভূমিকা পালন করে।

জটিলতা

  • সম্পর্কে জটিলতা।
  • কর্মক্ষেত্র বা স্কুলে জটিলতা।
  • হতাশা এবং উদ্বেগ।
  • বিভিন্ন ধরণের শারীরিক সমস্যা।
  • ড্রাগ বা অ্যালকোহলের অপব্যবহার।
  • আত্মঘাতী চিন্তাভাবনা বা আচরণ।

প্রতিকার

  • যে কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার জন্য যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
  • যোগাযোগের স্বাস্থ্যকর উপায়গুলো জানার জন্য বা মানসিক সঙ্কটের সাথে লড়াই করার জন্য থেরাপিতে অংশ নিতে পারেন।
  • প্যারেন্টিং ক্লাসে যোগ দিন এবং প্রয়োজনে থেরাপিস্ট বা সমাজকর্মীদের কাছ থেকে নির্দেশনা নিন।
  • স্বাস্থ্যকর পারিবারিক পরিবেশে থাকার চেষ্টা করুন।

Image Source: westermind.com

এই হলো নার্সিস্টিক পারসোনালিটি ডিজ-অর্ডারের সাদা-মাটা পরিচয়। তবে ধারাবাহিকভাবে এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হবে। বাংলাদেশে সন্তান পালনের পদ্ধতি কিংবা পরিবেশ কোনোটাই খুব স্বাস্থ্যকর নয়। অনেক শারীরিক রোগের প্রতিকারই যেখানে কঠিন, সেখানে কে ভাববে মানসিক রোগের কথা? কিন্তু ভাবতে হয়। অসুস্থ মন নিয়ে বেড়ে চলে সমাজে অপরাধ প্রবণতা।

তাই জানতে হবে, আমরা কিংবা আমাদের আশপাশের কেউ অসুস্থ কিনা মানসিকভাবে। তাহলে অন্তত অনেক ঐশী তৈরি হওয়া থেকে বেঁচে যাবে আমাদের এই সমাজ।

ভালো থাকুন। মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নিন। ধন্যবাদ।

Feature Image: psychcentral.com

Published by psychologytheoryy

I am searching for myself

এখানে আপনার মন্তব্য রেখে যান

Design a site like this with WordPress.com
শুরু করুন